গল্প ও কবিতা

চিরতা!

খাদিজা(আরুশি আরু)

‘ফুলতুলি’ গ্রামের ছোট্ট মেয়ে চারুলতা।দেখতে যেমন রূপবতী তেমনিই তার কথার ধার!নতুন কাঁচি যেমন ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে চলে তেমনি চারুর মুখ।সবাই তাকে চারু কম চিরতা বলেই বেশি ডাকে।আর ডাকবে নাই বা কেনো!উচিত কথা কারই বা সহ্য হয়!উচিত কথা যেমন অসহ্যকর চিরতা পাতাও তেমন অখাদ্য। তবে বড়ই কাজের জিনিস।সঠিক সময়ে ব্যবহারে উত্তম পথ্য।

সকাল হতে না হতে চিরতার মা আমেনা বেগমের ডাক পড়ে।সবাইকে সমীহ করে চলার অভ্যাস তার।আর চারু!সে তো কারো তোয়াক্কা করে না।নিজের যা মন চায় তাই করে।যা মুখে আসে তাই বলে।তবে উচিত কথাই বলে।কখনো মিথ্যে বা বানিয়ে কথা বলে না।

—চারুউউউ……ও চারুউউউ……কই মরলি বেডি!
—কি হইছে মা,বোলাও ক্যা?
—বোলামু নাতো কি করুম!হারাদিন ঘরের মইধ্যে কি?বাইর হ,কামে হাত লাগা।
—এহন কাম কাইজ কেন করুম!সেইতো শ্বশুর বাইত যাই কামই করোন লাগবো তোমার মতোন।তো বাপের বাইতও কাম শ্বশুর বাইতও কাম!বেচারি চারু যাইবি কোনহানে!মইরাইতো যাইবো তোমার ফুলের মতোন মাইয়াডা।
—এতো বেশি কথা কস ক্যান ছেমরি?তোর মায় যেডা কইছে হেডা কর।কাম কাইজে হাত লাগা।ফুলবানু সাজি ঘুরোনের লাইগা তোরে দুনিয়ায় আনে নাই।খালি তিতা তিতা কথা!মাইয়া মাইনসের এতো কথা কওন ঠিক না।জামাই খেডাই দিবো পরে।

এই হলো সালেয়া খাতুন।চারুর দাদী।তার খুব সখ ছিল,একটা নাতি হবে।তবে আল্লাহ দিলেন তার উল্টো।চারুর মতো একটা ফুটফুটে নাতিনী।কথায় আছে, “মানুষ যা চায় তা পায় না,আর যা পাশ তা চায় না”।তবে দাদী হিসেবে চারুকে তার যতটা ভালোবাসার কথা ততটাই ঘৃণা করেন তিনি।তার কারন সে মেয়ে এবং তার লাগামহীন কথাবার্তা।কখনো বনিবনা হয় না চারু আর সালেয়া খাতুনের।বাক বিতণ্ডা লেগেই থাকে!

—কি কইলা বু!কাম কাইজ করুম!তুমি তো এইহানের কুডাটা ওইহানে হরাই দেখো না!আর আমারে কও!আগে নিজে কাম করো পরে আমারে কইতে আইবা!আমার মার ঘাড়ে বইয়া বইয়া আর কতো খাইবা!গায়ে গতরে তো শক্তি কম নাই।হাত পাও চালাও।
—দেখছোস আমেনা!তোর মাইয়া কেমনে আমারে কথা হুনাইতাছে।এমনে করলে কে তুলবো এই মাইয়ারে ঘরে হুনি!
—আম্মা,আমনে ওর কথায় কান দেন ক্যান!ওয় তো হারাডা দিনই কথা কইতে থাকে।ছোড মানুষ।রাইগেন না আমনে।
ওই চারু তুই যা তো।উডানে গিয়া খেল।হুদাই আমার ঘরে আগুন লাগাস ক্যান!
—তোমারে আর কি কমু মা!তুমি হইলা আজিব কিসিমের মানুষ।দাদীর চামচাগিরি করা তোমার স্বভাব হই গেছে।নইলে তোমার মাইয়ারে যে কথা হুনায় তুমি তারে শান্ত কইরতা না।
আর হুনো দাদী,তোমার আর আমার মধ্যিখানে আমার মারে আইনবা না।মা আমার মাটির মানুষ।ঝোট ঝামেলা চায় না।নইলে পাশের বাড়ির ময়নার দাদীর মতো কবেই তোমারে খেদাইয়া দিতো!
—হোনো চেমরির কথা।চিরতা রে তোরে আমি খাইছি।খাড়া চেমরি,খাড়া!অহন ভাগোস ক্যা?
—বুড়ি খেপছেরে, বুড়ি খেপছে।ওরে কে কোথায় আছো মোরে বাঁচাও।এই বুড়ি আমারে মাইরা ফেল্লো গো!

গ্রাম গঞ্জে এই এক সুবিধা।হালকা চিৎকারে সবাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।চারুর চিৎকারেও আশেপাশের বাড়ির সবাই বেরিয়ে এসেছে।তাদের দেখেই দমে গিয়েছেন সালেয়া খাতুন।আর সে সুযোগে ছুট লাগায় চারু।

গ্রামের মোড়ল আখলাক শেখ।তার একমাত্র ছেলে জাহিদ শেখ।এই জাহিদ শেখই গ্রামের প্রথম মানুষ যে শহরে গিয়ে উচ্চ শিক্ষিত হয়েছে।তবে তার উচ্চশিক্ষার নেতিবাচক দিকও সবার সামনে!সে শহর থেকে নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে গতকাল রাতে বাড়ি ফিরেছে।সবাই কিছুটা রাগ করলেও শহরের মেয়েকে বাড়ির বউ করতে পেরে মোড়ল সাহেব গর্বে বুক ফুলিয়ে সবাইকে ফলাও করে শুনাচ্ছেন।আর ছেলের এই অবাধ্যতাকে ধামাচাপা দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন।উঠানে গিয়ে সবটা শুনার পর চারুও এসেছে নতুন বউকে দেখতে।

—আরে না না,আমার জাহিদ কি অবাধ্য নাকি!আমিই কইছি আমরা শহরে যাইতে পারমু না।তুমি বিয়া কইরা বউমারে লইয়া আহো।জাহিদ আমার সোনার টুকরা পোলা।আমার কথা ছাড়া এক পাও লাড়ায় না।
—মোড়ল জেডা,ও মোড়ল জেডা,মিচা কথা কও ক্যান?জাহিদ ভাইয়ে তো তোমারে না জানাই বিয়া করছে।কথাখান পাঁচকানও হইয়া গেছে।দুইদিন পরে সবে ভুইলাও যাইবো।তুমি হুদাই শক্তি খরচ কইরা সবাইরে মিচা কথা গিলাইতাছো ক্যান!
—চিরতা!তুই নতুন বউ দেখতে আইছোস বউ দেখ।মিষ্টি খা।তার পর বিদায় হ।
—জেডা,বয়স হইছে তোমার।এক পা তো কবরেই গেছে গা।তোমার কি মরনের ডর নাই।এমনে মিচার উপরে মিচা কইয়া যাইতাছো।একটু তো ডরাও!
—চিরতা তোরে……
—আরে চারু!তুই কখন এলি!চল ভিতরে। আর আমনে,বাচ্চা মাইয়াডার দিকে এমনে চোখ গোরাই তাকাই আছেন ক্যান!নিজের কামে যান তো।চল চারু।

এই হলো আখলাক শেখের স্ত্রী সুফিয়া বেগম।দেখতে শুনতে যথেষ্ট ভালো।এই মানুষটাকে খুব পছন্দ চারুর।তিনিও অবশ্য চারুকে নিজের মেয়ের মতোই আদর করেন।ওনার অনেক সখ ছিলো একটা মেয়ের কিন্তু শেষকালে হলো একটা ছেলে।তাই ছোট্ট চারুকে দিয়েই মেয়ের সখ পূরন করেন তিনি।ওই বলে না,”দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো”।ওই আরকি।তবে তার ছেলে জাহিদও চারুকে কম ভালোবাসে না।নিজের বোনের মতোই আদর করে।

—বড় মা,আমনে মোড়ল জেডারে কিছু কন না ক্যান!মিচা কথা কওন তো ভালা না।
—চারুরে আমি কি কমু ক!তোর মোড়ল জেডারে তো চিনস ই।
—আরে চিরতা যে!কেমন আছিস!
—জাহিদ ভাই!মুই ভালা আছি।তুমি কেমন আছো?
—ভালোই আছি।তা আমার বউকে দেখতে এতো পরে এলি যে?তুই জানিস তোর কথা তোর ভাবি এসেছে অবধি দশবারের উপরে জিজ্ঞেস করে ফেলেছে!
—কি কও জাহিদ ভাই!ভাবি আমারে চিনলো ক্যামনে!
—ক্যামনে আবার,তোর জাহিদ ভাই সব কইছে বউমারে আমাগো কথা।ভালা মাইয়া।যা গিয়া কথা ক।আমি মিষ্টি আনতাছি।
—আইচ্ছা।

একা ঘরে বসে আছে রিয়া।ছোট থেকেই শহরে মানুষ সে।গ্রামে এ প্রথম বার এসেছে।সকাল থেকে সবাই তাকে দেখতে আসছে।নিজেকে কোনো চিড়িয়াখানার প্রানী মনে হচ্ছে তার।এখনো ঘর ভর্তি মানুষ।আর তাদের মধ্যমনি রিয়া।সবার দৃষ্টি নতুন বউয়ের দিকে স্থির!

—তোমাগো কি আক্কেল জ্ঞান নাই!বাইর হও এখান থেইকা।নতুন ভাবীরে একটু জিরাইতে দাও।

চারুর কথার ধরন কারো অজানা নয়।তাই সবাই বেরিয়ে গেলো।নতুন বউয়ের সামনে নিজেদের মুখ নষ্ট করতে কেউই ইচ্ছুক নয়।
যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো রিয়া।তবে সবটা যার জন্য সম্ভব হয়েছে তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ধন্যবাদ না জানালেই নয়।জাহিদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো রিয়া!

—তোমাকে চিরতার কথা বলেছিলাম না!এ হলো সে।
—জাহিদ ভাই!চিরতা কও ক্যান।নতুন ভাবী আমি চারুলতা।ডাক নাম চারু।তয় অনেকেই চিরতা বোলায়।

মুচকি হেসে বিছানা থেকে নেমে চারুর কাছে আসে রিয়া।তার হাত ধরে বিছানায় বসায়।তারপর নিজেও পাশে বসে।

—ধন্যবাদ চারু।জানোতো চারু তোমার অনেক গল্প শুনেছি জাহিদের কাছে।
—হিহিহিহিহি……

জাহিদের দিকে তাকিয়ে হাসছে চারু।জাহিদ রিয়া দুজনের দৃষ্টিতে বিস্ময় স্পষ্ট।

—হাসছিস কেনো চিরতা?
—তুমি নতুন ভাবীরে কও নাই যে, হগলের সামনে তোমারে নাম ধইরা না ডাকতে!কেউ হুনলে পুরা গেরাম করবো বুঝো হেডা?
—এইরে আমারতো খেয়ালই নেই।
—কি সাংঘাতিক।নাম ধরে ডাকা যাবে না বুঝি!
—হ নতুন ভাবী।এইডা গোরাম।স্বামী পরম গুরুজন।নাম ধইরা ডাকলে ঘোর পাপ।
—ও।আচ্ছা শুনো না চারু,তুমি নাহয় প্রতিদিন এসো আমার কাছে।গ্রামেতো আমি নতুন,কোথায় কি বলতে হয় আমিতো জানি না।শিখিয়ে দেবে আমায়।কি আসবে তো?
—সে নাহয় আমু।
—দরজার দিকে কি দেখোস চিরতা?
—বড়মায় কইলো মিষ্টি খাওয়াইবো তয় আইলো না এখনো!আমারতো আবার বাড়ি যাওন লাগবো।মায় চিন্তা করতাছেতো।
—এইতো মিষ্টি লইয়া আসছি।
—নাম লইতে না লইতে বড়মায় হাজির।অনেক দিন বাঁচবা তুমি বড়মা।
—দুপরে খাইয়া যাইস।
—না বড়মা।মারে কইয়া আসি নাই।আইজ যাইগা। কাইল আবার আমু।

টুপ করে মুখে একটা মিষ্টি পুরে দিলো চারু।সেটা চিবুতে চিবুতে বের হয়ে যাচ্ছে সে।

—কালকে আসবে তো চারু?
—আমুনা মানে!নিঃশ্চই আমু।এই চারু মিচা কথা কয় না ভাবী।ভাইরে জিগাইয়ো।
—আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো চারু!

মোড়ল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে চারু।তার জাকড়া চুলগুলো কোমর অবধি ছাড়া।বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলা করছে তার অবাধ্য চুলগুলো।তবে সেদিকে চারুর খেয়ালই নেই। সেতো মনের সুখে গান গাইতে গাইতে বাড়ির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।তবে তার যাওয়ার পথে রিয়ার দৃষ্টি স্থির!যানজটের ব্যস্ত শহরের আধুনিক মেয়েটা যে গ্রামের এই ছোট্ট চারুর সারল্যে মুগ্ধ,রিয়ার স্থির দৃষ্টিই হয়তো তার প্রমান!

**সমাপ্ত**

সম্পূর্ণ লেখাটি পড়ুন

এই ধরনের সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close