গল্প ও কবিতা

উপলব্ধি অতঃপর প্রত্যাবর্তন

লুৎফুন নাহার তিথি

সায়মা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমু দিচ্ছে আর শেষ বেলার লাল গোধুলিকে উপভোগ করছে খুব। স্রষ্টার সৃষ্টি যে কতোটা সুন্দর, কতোটা চোখ জুড়ানো তা প্রতিটি সৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখলেই বুঝা যায়।

তখনই সায়মার কুরআনের একটি আয়াত মনে পড়লো–

“সুতরাং তোমার রবের কোন কোন অনুগ্রহকে তুমি অস্বীকার করবে?”
[কুরআন: ৫৫:১৩]

অন্তর প্রশান্ত হয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে সায়মা আনমনেই বলে উঠলো “আলহামদুলিল্লাহ”

চায়ের কাপের চা ফুরিয়ে এসেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠবে তখনই মিতার কল।
— হ্যালো সায়মা। জানিস আজকে…
মিতাকে থামিয়ে দিয়ে,
— আসসালামুয়ালাইকুম। কেমন আছিস মিতা?
সায়মার হঠাৎ সালাম দেওয়াকে মিতা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারলো না। তাই মিতার কন্ঠে দুই/তিন সেকেন্ডের নীরবতা বিরাজ করলো।
অস্বাভাবিকভাবে নেওয়ারই কথা। কেননা যেই সায়মা কল রিসিভ করে মিতার মতোই “জানিস?” শব্দ দিয়ে কথা শুরু করতো, সেই সায়মা যখন সালাম দিয়ে কথা শুরু করে তখন তো মিতার কাছে অস্বাভাবিক লাগবেই।

দুই/তিন সেকেন্ডের নীরবতা ভেঙ্গে মিতা কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলো,
— ওয়া আলাইকুমুস সালাম, আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
— আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তো কি জানি বলতে চেয়েছিস?
— সেটা না হয় বলবো। আগে বল এতো হুজুর হয়ে গেলি হঠাৎ? দেখলাম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম সব জায়গা থেকে সব পিক, ভিডিও ডিলিট করে দিলি। টিকটক আইডি ও ডিলিট করে দিলি। হঠাৎ হয়েছে কি তোর?
মিতার এতো প্রশ্নের জবাবে সায়মা বললো, “রবের দিকে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি শুরু করেছি। তাঁর দিকেই যে আমাদের প্রত্যাবর্তন।”

এই প্রথম মিতার সায়মার সাথে কথা বলতে অস্বস্তি লাগছে। কেমন যেনো তাঁর কাছে সায়মাকে খুব অচেনা লাগছে।

মিতাকে চুপ করে থাকতে দেখে সায়মা বলে উঠলো, “আচ্ছা তুই কি যেনো বলতে চেয়েছিলি? জলদি বল। মাগরিবের আযান দিবে এখন।”
— তো মাগরিবের আযান দিবে তো কি হয়েছে?
— নামাজ পড়বো।
এবারো মিতা সায়মার এমন জবাবে চুপ হয়ে গেলো। সায়মা বুঝতে পারে আজকে আর হয়তো মিতার বলতে চাওয়া কথা শুনা হবে না। তবে মিতা কি বলতে চাইছে সেটা ও কিন্তু সায়মার অজানা নয়। ঐ তো প্রতিদিনের মতো আজকে কোন ব্রান্ডের লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন কিনেছে সেগুলোর কথাই জানাতে চাচ্ছে। কারণ সায়মা আর মিতার গল্পের ৯০ ভাগ সময়ই এসব নিয়ে আলোচনায় কাটে।
যেহেতু মাগরিবের সময় হয়ে এসেছে তাই মিতা আর কথা না বাড়িয়ে সায়মাকে বললো কালকে কলোনির পার্কে দেখা করতে। সায়মা জানালো সে আসবে।

কল কেটে মিতা কিছুক্ষণ চুপ হয়ে আছে। মনে হচ্ছে খাঁচার ভিতর বন্দী কোনো পাখি ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছে। কি ভেবে যেনো ইন্তিহাকে কল দিলো সে।
— হ্যালো!
— শুন ইন্তিহা, কালকে কলোনির পার্কে বিকেল পাঁচটায় আসিস। সায়মা ও আসবে।
— কিন্তু হঠাৎ করে? কিছু হয়েছে নাকি?
— সায়মার সোসাল মিডিয়া আইডি দেখছিস?
— হুম, সব ডিলিটেড।
— তোর কাছে স্বাভাবিক লেগেছে?
— হয়তো রাগ করে সব হাইড করে রেখেছে। দুই দিন পর আবার ঠিক হয়ে যাবে।
— পার্মানেন্টলি সব ডিলিট করেছে ও। আজকে কল দিয়েছিলাম। অনেক পরিবর্তন দেখলাম।
— কেমন পরিবর্তন?
— এখন এতো কথা বলতে পারবো না। কালকে আসলেই ওর থেকে সব জানিস।
— আচ্ছা।

পরের দিন মিতা আর ইন্তিহা সায়মার জন্য কলোনির পার্কে অপেক্ষা করছে।
৫টা ২৫ এ সায়মা আসলো। আপাদমস্তক কালো কাপড়ে আবৃত। হাত মোজা পা মোজা ও পড়েছে। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। মিতা বলে না ডাকলে হয়তো মিতা আর ইন্তিহা সায়মাকে চিনতেই পারতো না। সায়মাকে এমনভাবে দেখে ইন্তিহা আর মিতা হতভম্ব হয়ে আছে। ইন্তিহা জিজ্ঞেস করলো “পাঁচ মিনিটের রাস্তা তোর বাসা থেকে। তো এতো লেট করে এসেছিস কেনো।”
সায়মা শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো “নামাজ পড়ে এসেছি,তাই লেট হয়েছে।”
ইন্তিহা আর কিছুই বললো না। তবে মিতার মন খুব হাঁসফাঁস করছে সায়মার হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারণ জানার জন্য। তাই জিজ্ঞেস করেই বসলো,
— হঠাৎ তোর এমন জিন্স টপ ছেড়ে বোরকাতে ঢুকে যাওয়ার কারণ কি জানতে পারি?
সায়মা লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললো “আচ্ছা তাহলে শুন,
বলতে লাগলো সায়মা। ইন্তিহা আর মিতা ও ঘোর মনোযোগ নিবেশ করলো।

“কিছুদিন আগে ইনস্টা মেকাপ ইনফ্লুয়েন্সার তোনিমা খান আপু ২১ বছর বয়সে হিট স্ট্রোক করে মারা যান সেটাতো তোরা ও জানিস। সেদিন ওনার মৃত্যু আমাকে খুব ভাবিয়ে তুললো। ১.২ মিলিয়ন ফলোয়ার ওনার। কিছুদিন পর “ইনস্টা ইনফ্লুয়েন্সার” এওয়ার্ড ও পাওয়ার কথা ওনার। অথচ আজ উনি কবরে। ফেসবুক ,ইনস্টা, ইউটিউব জুড়ে ওনার কতো ভিডিও,পিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই যে এতো এতো নাম,খ্যাতি, ফলোয়ার্স কেউই কি পারলো তাকে মৃত্যু থেকে ফিরিয়ে আনতে? পারলো না। আল্লাহ ছাড়া কারো এই ক্ষমতা নেই। সেদিন আমি খুব ভাবলাম আমাদের কি করা উচিত আর আমরা কি করছি? যেখানে যেকোনো সময় আল্লাহর হুকুমে মৃত্যুদূতের উপস্থিত ঘটতে পারে।‌ নশ্বর এই দুনিয়ার মায়ায় পড়ে পার্থিব জীবনের চাহিদায় এতোই তলিয়ে গেছি যে চিরস্থায়ী সুখের স্থান জান্নাত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে ফেলছি। ভুলতে বসেছি একদিন আমাকেও আমার রবের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আমার কর্মের হিসেব নেওয়া হবে। অথচ আমরা কি না নফসকে খুশি করাতে ব্যস্ত। লোভী নফস জাহান্নামের দিকে ধাবিত করছে আমাদের। দুনিয়ার এই দুই দিনের সুখের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের বাসিন্দা হওয়ার টিকেট কিনছি। তাইতো রাব্বুল আলামীনের রহমতে আমার উপলব্ধি ঘটলো। বলতে বলতে সায়মার চোখদ্বয় অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠলো। ইন্তিহা আর মিতার চোখে মুখে ও কিছুটা উপলব্ধির আবির্ভাব বিদ্যমান।

চোখের জল টপকানোর আগেই হাতের রুমাল দিয়ে মুছে আবারো বলতে শুরু করলো সায়মা।

“অনেকেই তোনিমা আপুর মৃত্যুকে আকস্মিক মৃত্যু বলছে। আকস্মিক মৃত্যু বলতে কিছু নেই। যার সময় যখন ঘনিয়ে আসবে তাঁর মৃত্যু তখন অবধারিত।

কালকে কুরআনে পড়েছিলাম “প্রত্যেক প্রাণী এ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”
[কুরআন: ৩:১৮৫]

কিন্তু নিজেদের কতোটুকু প্রস্তুত রেখেছি আমরা?
কুরআনে আছে “যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়।”
[সূরা আল-মুলক: আয়াত:২]

হঠাৎ সায়মার কথার মাঝখানে ইন্তিহা প্রশ্ন করে উঠলো “তাহলে তো কতো পাপ করেছি আমরা। আল্লাহ কি আমাদের এতো পাপ ক্ষমা করে দিবেন?”
ইন্তিহার প্রশ্নে সায়মা একটু মুচকি হাসি দিলো। সে কুরআনের একটি আয়াত তুলে ধরলো “যারা তাঁর পানে অনুতাপ করে ফেরে, নিজেদের পবিত্র করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন” ‌
[কুরআন ২:২২২]

আল্লাহ যে কতো ক্ষমাশীল তা আমাদের ধারণার বাহিরে। তিনি সবসময় অপেক্ষা করেন আমরা তাঁর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে যাই। তিনি তওবাকারীদের ভালোবাসেন।কিন্তু দূর্ভাগা আমরা পার্থিব জীবনে লিপ্ত হয়ে তিলে তিলে নফস ধ্বংস করছি আর খরিদ করছি জাহান্নাম।

সায়মার মোবাইল সেট করা এলার্ম বেজে উঠলো। মাগরিবের আযান দিবে এখন। বেলা ফুরিয়ে আসছে। নীড়ে যে ফিরতেই হবে।

মিতা আর ইন্তিহা থেকে সায়মা বিদায় নিলো। মিতা আর ইন্তিহা এক দৃষ্টিতে সায়মার চলে যাওয়াকে দেখছে। মিতার মনের খাঁচার পাখিটার ডানা ঝাপটানোর শব্দ পাচ্ছে না সে। মনে হচ্ছে বন্দি পাখি মন ভরে নিঃশ্বাস নিতে ব্যস্ত। হয়তো সে তাঁর নীড় খুঁজে পেয়েছে।

ঈদের ছুটির এক সপ্তাহ পর সায়মা স্কুলে গেলো। ক্লাশে ঢুকতেই দেখলো সামনের বেন্ঞ্চে আপাদমস্তক কালো বোরকাতে আবৃত দু’টো মেয়ে বসে আছে। সায়মার চোখ ইন্তিহা আর মিতাকে খুঁজছে। ঠিক ঐ দিনের মতো দুটি কন্ঠ সায়মা বলে ঠেকে উঠলো। কন্ঠ দুটো সামনের বেন্ঞ্চে বসে থাকা মেয়ে দুটোর। তাঁরা এসে জড়িয়ে ধরলো সায়মাকে। সায়মা হতভম্ব হয়ে আছে।
মিতা বলে উঠলো “তুই এতো স্বার্থপর কেনো? জান্নাতের বাগিচায় নিজে একা হাটবি? বান্ধবীদের নিয়ে হাঁটার ইচ্ছে নেই বুঝি?”
সায়মার চোখ আনন্দে ভিজে উঠলো। পরম আবেশে ইন্তিহা আর মিতাকে জড়িয়ে ধরলো আর আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো।

সম্পূর্ণ লেখাটি পড়ুন

এই ধরনের সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close