গল্প ও কবিতা

ইচ্ছে-দুপুর,পর্বঃ৩

খাদিজা আরুশি আরু

বাবার উপর অভিমানটা এতোটা তীব্র হলো যে,আমি বাড়ির সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিলাম।একদিন সন্ধ্যায় আমার নামমাত্র বরের দ্বিতীয় মেসেজটি এলো।তাতে লেখা,”আমি প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় কল করবো।আপনি শব্দ করে পড়বেন আর আমি শুনবো।কথা বলতে হবে না।দশটা বাজলে আমি ফোন কেটে দেবো।ঠিক সাড়ে দশটায় আবার কল দেবো।রাত দেড়টা পর্যন্ত আপনি আবার পড়বেন।তারপর ঘুমাবেন।আপনার পেছনে যে টাকা খরচ করছি তা এমনি এমনি আসে না।অনেক কষ্ট উপার্জন করতে।টাকা দিতে সমস্যা নেই।তবে অপাত্রে অর্থব্যয় আমার অপছন্দের।তাই বলছি,যা যা বললাম তা তা করবেন।নতুবা আপনার পড়াশুনা বন্ধ করতে আমার বেশি সময় লাগবে না।আর আপনার বাবা ফোন করলে ফোন ধরবেন।গুরুজনদের অসম্মান করা আমি বরদাস্ত করি না।এক্ষেত্রে আমার যদি আপনার গায়ে হাত তুলতে হলে আমি তুলবো।ইসলামে স্ত্রী কে শাসন করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।আশা করি আপনি আমাকে কঠোর হতে বাধ্য করবেন না”।

মেসেজটা পড়ে আমি রাগে কান্না করে দিয়েছিলাম।এভাবে অপমান!আমি তার কথা না শুনলে আমার পড়া বন্ধ করে দেবে,আমি কথা না শুনলে আমাকে মারবে!বাবার মেধাবী জামাইয়ের এই নমুনা।মেসেজটা তুর্জকে ফরওয়ার্ড করে পড়তে বসলাম।সঙ্গে সঙ্গে কল করলাম আমার বরের নাম্বারে।কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই জোরে জোরে পড়তে লাগলাম।

মনে মনে বাবাকে বকছিলাম।এ কোন লোকের কাছে আমায় বিয়ে দিলো,যে কি না নিজের বিয়ে করা বউকে সন্ধ্যার পর সাড়ে পাঁচ ঘন্টা পড়তে বলে।আরে বেটা, বিয়ে করেছিস কি বউয়ের সঙ্গে টিচারগিরি করার জন্য।রাগে দুঃখে সিদ্বান্ত নিলাম ডাক্তারি পাশ করার পর এই মাস্টার মশাইকে আমি ছেড়ে দেবো।এমন নামের বিয়ে আমার চাই না।যে বর কিনা বউয়ের উপর টিচারগিরি করে তার সঙ্গে আর যাই হোক আমি সংসার করতে পারবো না।

আমার বরের তদারকিতে আমার পড়ালেখা বেশ ভালোই চলছিলো।ইউনিট টেস্টগুলোতে আমার রেজাল্ট সবার থেকে ভালো হতে লাগলো।এরই মাঝে ডিএম আমাদের হোস্টেলের দায়িত্ব পেলেন।উনি আসার পর ঘোষনা দিলেন হোস্টেলের সব স্টুডেন্টরা ক্লাসের পর লাইব্রেরীতে বসে তার কাছে তিন ঘন্টা পড়বে।ক্লাস শেষ হতো দুইটার পর। কোনো রকম লাঞ্চ করে একটু রেস্ট নিতে না নিতে তিনটা বেজে যেতো।বই নিয়ে ছুটতাম লাইব্রেরীতে।সেখানে বসে ছয়টা পর্যন্ত পড়ে একটু নাস্তা আর রেস্ট করে সাড়ে সাতটায় আবার পড়তে বসা,সব মিলিয়ে শেষ তিনটা বছর আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।

আমার রেজাল্টের উত্তরোত্তর উন্নতির দরুন ডিএম এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক বন্দুত্বসুলভ হতে লাগলো।আমরা প্রায়ই বাইরে ঘুরতে যেতাম।আমার মধ্যে কখনো প্রেম ছিলো না।তবে আমাদের সম্পর্ক ছাত্রী শিক্ষকেরও ছিলো না।এ সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বলা চলে কি না তাও জানি না।

সেদিন আমার পরিক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছিলো।আমি টপ করেছি।ভেবেই অবাক লাগছিলো,যে মানুষটাকে আমি আমার পড়াশুনা নষ্টের জন্য দায়ী করছিলাম সেই মানুষটার ভূমিকা আমার সাফল্যের পেছনে অত্যধিক।

রেজাল্টের দিন আমার কাছে আহসান স্যার এলেন।স্যার এসেই আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—ইচ্ছে মা,তোমার মনে আছে তুমি যেদিন প্রথম এসেছিলে সেদিনের কথা?
—জ্বী স্যার মনে থাকবে না কেনো?সেদিন আপনি না থাকলে যে আমার কি হতো!
—বোকা বোকা কথা বলো না তো ইচ্ছে। কারো জন্যই কিছু আটকে থাকে না।আমি না থাকলে আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকতো।হ্যাঁ ঘটনার ভিন্নতা দেখা দিতো তবে কিছু তো একটা হতো।

মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার পর যখন আমি বাবার সঙ্গে রাগ করে হোস্টেলের ভেতরে চলে গেলাম তখন বাবার শুকনো মুখটা মনে পড়ে ভীষণ কান্না পাচ্ছিলো।হোস্টেলের দৌতলার সিঁড়ি ঘর থেকে যখন দেখলাম বাবা তখনও নিচে দাঁড়িয়ে আছেন সে মুহূর্তে বুকে ব্যাথা করছিলো আমার।আমার বাবা,আমার জন্য কষ্ট পেয়েছে, হয়তো চোখের কোনে জলও চিকচিক করছে ভাবতেই আমার নিজেকে পাগল পাগল লাগছিলো।তাই সিঁড়িতে বসেই কাঁদতে শুরু করেছিলাম।আমার তখন হিতাহিত জ্ঞান ছিলো না।তখন হোস্টেলে দায়িত্বে ছিলেন আহসান স্যার আর নাহিন ম্যাম।সে সময় আহসান স্যার উপরে যাচ্ছিলেন।

আমাকে ওভাবে সিঁড়িতে বসে কাঁদতে দেখে উনি আমার পাশে এসে বসে মাথায় হাত রাখলেন।মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিলেন,

—তোমার নাম কি মা?

আমি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম,

—আমার নাম ইচ্ছেবিলাসী মাহবুব।সবাই ইচ্ছে ডাকে।
—বাহ,দারুন নাম তো।তা ইচ্ছে তুমি এভাবে কাদছো কেনো?সবাই দেখলে কি ভাববে বলো তো?
—কি ভাববে?
—তুমি ছিঁচকাঁদুনে।
—আমি ছিঁচকাঁদুনে না।আমি ইচ্ছেবিলাসী, ইচ্ছেবিলাসী ছিঁচকাঁদুনে হতেই পারে না।
—তাহলে চোখের জল মুছো।
—মুছলে কি হবে নাকি?আমার যে ভীষণ কান্না পাচ্ছে।
—একটা কথা বলি?
—আপনি বড়,বলতে তো দোষ নেই।বলুন…তাছাড়া সব বড়রা আমাকে আজকাল কথা শোনায়।আপনিও নাহয় একটু শোনাবেন।
—তুমি কি জানো,কষ্ট ভাগ করে নিলে কষ্ট কমে?
—আমার কষ্ট শুনার কেউ নেই।সবাই কেবল আমাকে কষ্ট দিতে জানে।আমার কষ্ট ভাগ করে নিতে কেউ জানে না।
—আমি তোমার কষ্ট ভাগ করতে চাই।সে সুযোগ দেবে?
—আপনি এতো বড় হয়ে আমার কষ্ট কেনো ভাগ করতে চাইছেন?
—তাহলে আগে আমার কষ্টটা তোমায় বলি?
—আপনারও কষ্ট আছে?
—জীবনে কেউই সম্পূর্ণ সুখী নয় ইচ্ছে।এই যে তুমি ভাবছো তুমি অসুখী,বুকে হাত রেখে বলো তো তোমার জীবনে কি কখনো সুখ আসে নি?
—আমার জীবনে সুখ বরাবরই ছিলো।গত দশদিনে সব সুখ শেষ হয়ে গেছে।
—আমার একটা কষ্ট তোমাকে বলি?তাহলে বুঝবে তোমার কষ্ট কেনো ভাগ করে নিতে চাইছি।
—বলুন।
—আমার বিয়ের যখন পঁচিশ মাস বয়স তখন আমি জানতে পারি আমার স্ত্রী অন্তসত্ত্বা।আমার খুশির সীমা ছিলো না।বাচ্চার জন্য এতো মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম যে আমার স্ত্রীর শারিরীক সমস্যাগুলো ডাক্তার হয়েও আমার চোখে পড়ে নি।সাত মাসের মাথায় হঠাৎ অনেক ব্লিডিং শুরু হলো।তখন আমি একটা ক্যাম্পিং এর জন্য ঢাকার বাহিরে।আমার পরিবার আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো।তখনকার দিনে মোবাইল ফোন এতোটা এভেলএভেল ছিলো না।আমার ক্যাম্পের ফোনে ফোন করে খবর দেয়া হলো।আমি তখন ফিল্ডে।খবর পেলাম রাতে খেতে বসে।আমরা তখন যে এলাকায় ছিলাম সে এলাকায় গাড়ী তেমন পাওয়া যেতো না।কাঁচা রাস্তাতো,যদিও এখন অনেক উন্নতি হয়েছে সবকিছুর।রওনা দেবার জন্য সকাল হবার অপেক্ষা করতে হলো।ভোর সাড়ে ছয়টায় আমি রওনা দিলাম।ততোক্ষণে আমার পরিবার তাদের জীবনের জঘন্য কাজগুলোর একটা করে বসলো।
—কি কাজ?
—ডাক্তার এসে আমার পরিবারকে বলেছিলো,”পেশেন্টের অবস্থা গুরুতর।দ্রুত অপারেশন করতে হবে।তবে অপারেশনে যে কোনো একজনকে বাঁচানো সম্ভব।আপনারা কাকে বাঁচাতে চান”?আমার পরিবার আমার সন্তানকে বাঁচানোর সিদ্বান্ত নিয়েছিলো।আমি যখন হাসপাতালে পৌঁছালাম ততোক্ষণে আমার স্ত্রী মারা গিয়েছিলো।সে মুহূর্তে আমার পরিবারের প্রতি তীব্র ঘৃণা অনুভূত হলো।যে মানুষটা তার নিজের বাড়ি,পরিবারকে ছেড়ে আমার কাছে এলো তার জীবনটা শেষ করে দেয়ার সিদ্বান্ত আমার পরিবার এতো সহজে কি করে নিতে পারলো ভেবে পাচ্ছিলাম না আমি।একটা বাড়ির বউয়ের জীবন কি এতোটাই মূল্যহীন!শুনেছি ছেলেদের কাঁদতে হয় না।কিন্তু আমি সেদিন চিৎকার করে কেঁদেছিলাম।আসলে আমার চাকরিজীবনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যক্তিজীবনে দায়িত্ব পালন না করতে পারার অপরাদবোধ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো।হঠাৎ নার্স এসে আমার কোলে আমার ছোট্ট পুতুলের মতো মেয়েটাকে দিয়ে গেলেন।বাচ্চাটাকে দেখার পর আমি কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম।আমার স্ত্রী বিন্দির মাঝে যতো মায়া ছিলো সব মায়া যেনো সৃষ্টিকর্তা বাচ্চাটার মাঝে ঢেলে দিয়েছিলেন।বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কতোক্ষণ আমি বিন্দির লাসের কাছে বসে ছিলাম আজও আমি হলপ করে বলতে পারি না।তবে আমার কাছে সে সময় মনে হয়েছিলো সময়টা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, কারন আমার সামনে বিন্দি আর আমার মেয়ে দুজনেই আছে।একবারের জন্য মনে হয়নি যে,ওটা তো একটা মৃত লাশ।বারংবার মনে হয়েছিলো এই তো আমার সন্তানের মা আমার সামনে শয্যায় শুয়ে আছে।আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার বাচ্চার মা,আমার চোখে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা যে কি না নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমার বাচ্চাকে পৃথিবীতে এনেছে।বিশ্বাস করো ইচ্ছে একটাবারও মনে হয় নি ওটা লাশ,একটাবারও না।

চলবে…

সম্পূর্ণ লেখাটি পড়ুন

এই ধরনের সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close